গণভোট ব্যর্থ হলে, এই সরকারকেও ব্যর্থ করে দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতের আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
শনিবার বিকেলে বরিশাল নগরের বান্দরোডে কেবি হেমায়েত উদ্দিন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যজোট আয়োজিত বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা নতুন শাসনব্যবস্থা চাই, গণভোটের রায়ের বাস্তবায়ন চাই। ম্যাকানিজমের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে তারা গণভোটের রায় ভুলে গেছে। জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন না হলে এই সরকারকে জনগণ সরকার হিসেবে মেনে নেবে না।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সংসদে একজন অবৈতনিক শিক্ষক আছেন, যিনি প্রায়ই সংবিধান শেখান। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলে তার পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আপনারা ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছেন, যা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।’
দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, ‘ভোলাবাসীর ন্যায্য দাবি সেতু নির্মাণ এবং দক্ষিণাঞ্চলে রেললাইন স্থাপন করতে হবে। বরিশালকে বঞ্চিত রেখে দেশের সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। যেখানে বৈষম্য থাকবে, সেখানেই আমরা সোচ্চার হব।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভুল পথ থেকে ফিরে এসে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করুন। ২৫ জুলাই সিলেটের সমাবেশের আগেই এ দাবি মেনে নিন, অন্যথায় ঢাকায় মহাসমাবেশের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’
সরকারের সমালোচনা করে জামায়াতের আমির সমাবেশে বলেন, ‘জনগণের সঙ্গে আর কত ধোঁকাবাজি করবেন? প্রয়োজনে নতুন বাংলাদেশ গড়ব। জুলাই আন্দোলনে মানুষ জীবন দিয়েছে, কিন্তু মাথা নত করেনি। জনগণ যখন প্রকৃত ফ্যাসিবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন ডামি ফ্যাসিবাদকেও প্রত্যাখ্যান করবে।’
আমরা রাজপথে থাকতে চাই না, সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিন্তু জনগণের রায় অমান্য করা হলে আন্দোলনের পথেই যেতে হবে। সময় থাকতে ভালো হয়ে যান। তেল, গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। মানুষের হাতে ফ্যামিলি কার্ড ধরিয়ে দিয়ে দায় এড়ানো যাবে না। প্রয়োজন হলে হাতে চিড়া-মুড়ি নিয়েই আবারও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নামতে হবে।’
বিভাগীয় সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন,জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি ও বরিশাল অঞ্চল পরিচালক মুয়াযযম হোসাইন হেলাল।
গণভোটের বাস্তবায়ন না হলে আবার গণঅভ্যুত্থান
সমাবেশে গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন না হলে তাঁরা গণঅভ্যুত্থানের মতো কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এখনো হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। তবে প্রয়োজন হলে যে কোনো সময় এমন কর্মসূচি দেওয়া হবে।’
শনিবার বিকেলে বরিশাল কেন্দ্রীয় হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে বাংলাদেশ জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্যে জোটের বিভাগীয় সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন কথা বলেন।
সমাবেশে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সরকারপ্রধান গণভোট ও জুলাই সনদের পক্ষে প্রচার চালালেও নির্বাচনের পর জনগণের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, ‘মুখে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।’
সরকার প্রধানের সমালোচনা করে সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মুখে মধু, অন্তরে ছলনা।’ এসময় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দেশের জনগণ আপনাকে ক্ষমতা দিয়েছে, তার মানে এই নয় যে যা খুশি তাই করবেন বা জনগণের সঙ্গে ছলনা করবেন।’
বিএনপির সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘গত ১৬ বছর দলটি গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করলেও ৫ আগস্টের পর থেকে তারা গণতন্ত্রের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।’ তাঁর দাবি, ‘বিএনপি মূলত গণতন্ত্রের জন্য নয়, ক্ষমতার জন্য আন্দোলন করেছে।’
তিনি বলেন, ‘তারা গণঅভ্যুত্থানে আমাদের সঙ্গে ছিল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে এখন আর পরিবর্তন বা সংস্কারের কথা বলে না। এমনকি তাদের ঘোষিত ৩১ দফার কথাও তারা ভুলে গেছে। অথচ ৩১ দফার প্রথম প্রস্তাবই ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন।’
সংবিধান সংস্কারের নামে কোনো প্রহসন মেনে নেওয়া হবে না উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম এসময় বলেন, ‘ প্রয়োজন হলে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং নতুন গণপরিষদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”
বরিশালের কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি। বরং ছাত্রদল, যুবদল ও কৃষকদলের চাঁদাবাজি বেড়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি।’
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন, সীমান্ত ব্যবস্থার সংস্কার, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্মূল, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মতো আবারও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
সমাবেশ শুরু হয় দুপুর ২ টায়। থেমে থেমে বৃষ্টি আর ঝোড়ো আবহাওয়ার মধ্যেও বরিশাল নগর ও বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে বেলা ১২ টার পর থেকেই সমাবেশস্থল নগরের বান্দ রোডের কেবি হেমায়েত উদ্দিন ইধগাহে সমবেশ হন।
সমাবেশে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে। আওয়ামী লীগ আর কখনো বাংলাদেশে আসবে না।
অলি আহমেদ অভিযোগ করেন, ভারতে প্রতিনিয়ত মসজিদ জ্বালিয়ে দিচ্ছে, মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করছে। বিভিন্ন রকম উসকানিমূলক কথা বলছে। আমরা কিন্তু এতে কান দেব না। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ (এবি) পার্টির মহাসচিব আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ( ফুয়াদ), বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ইরান,জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান,নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ, এনসিপির যুগ্ম মূখ্য সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম মিতু প্রমুখ।