সাংবাদিকতা পেশাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার মতো কোনো কাঠামো এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি, আর সে কারণেই সাংবাদিকতা পেশা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, বর্তমানে তথ্য ফিল্টারিং করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণমাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র ব্যবহার করে দুই ধরনের মানুষ কাজ করছেন বলে উল্লেখ করে তথ্য মন্ত্রী বলেন, একদল তথ্যপ্রবাহে বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন, আরেক দল সাংবাদিকতার আড়ালে তথ্যকে দূষিত করছেন। এ কারণে সাংবাদিকতার সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আজ সোমবার দুপুরে বরিশাল সার্কিট হাউস মিলনায়তনে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট আয়োজিত ‘বরিশাল বিভাগের সাংবাদিকদের কল্যাণে করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, কোনটি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা আর কোনটি ব্ল্যাকমেইলিং, সেই বিভাজন স্পষ্ট করা না গেলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করা সম্ভব নয়। তবে এ কাজ সরকার একা করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক সমাজকেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এসময় বলেন, সাংবাদিকতা পেশাকে কাঠামোবদ্ধ করতে না পারার কারণে একসময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘ফ্রিডম অব প্রেস’। এখন তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মিসইনফরমেশন’ বা অপতথ্য।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে যে সব বিশিষ্ট সম্পাদক, সাংবাদিক ও পত্রিকার মালিককে তিনি সাক্ষাৎ করিয়েছেন, তাঁরা সবাই জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে তাঁরা কোনো ধরনের চাপ অনুভব করেননি। তবে সাংবাদিকদের জীবনমানের গুণগত পরিবর্তন হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও বিবেচনা করতে হবে। সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা বেড়েছে কি না, বেতন-ভাতার নিশ্চয়তা, কর্মপরিবেশ এবং মালিক ও সাংবাদিকের মধ্যে সম্মানজনক সম্পর্ক নিশ্চিত হয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও দেখতে হবে। ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নে সরকার যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে কি না, সেটিও ভাবার বিষয়।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, এখন আর রাষ্ট্র বনাম স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরোধই একমাত্র বিষয় নয়। বরং একজন যোগ্য, পেশাদার ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে এ পেশায় টিকে থাকতে পারছেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অবসরপরবর্তী জীবনে একজন সাংবাদিক অন্য পেশাজীবীদের মতো নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারবেন কি না, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
সাংবাদিকদের কল্যাণে সবার সহযোগিতা কামনা করে এসময় তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি মালিকপক্ষের সঙ্গে ওয়েজ বোর্ড, সম্পাদকদের সঙ্গে সম্পাদকীয় নীতিমালা এবং সাংবাদিক ইউনিয়নের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন।
সরকারি বিজ্ঞাপন, মিডিয়া তালিকাভুক্তি ও ক্রোড়পত্র বণ্টনের ক্ষেত্রেও কার্যকর নীতিমালা নেই বলে মন্তব্য করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী। তিনি বলেন, টেলিভিশন সাংবাদিকতায় টিআরপি নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। মাত্র কয়েকটি সেট-টপ বক্সের তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্তিকর হিসাব উপস্থাপন করা হচ্ছে। একইভাবে অনেক পত্রিকার প্রচারসংখ্যা নিয়েও ভুল তথ্য দেওয়া হয়।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘যে পত্রিকা এক লাখ কপি ছাপে, তাকে ১০ লাখ কপির পত্রিকা বলা হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারও আনুষ্ঠানিকভাবে সেই ভুল তথ্যের অংশীদার হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি জানান, সরকার এরই মধ্যে বিজ্ঞাপন বণ্টন, মিডিয়া তালিকাভুক্তি, ক্রোড়পত্র বণ্টন, টিআরপি এবং সংবাদপত্রের রেটিং ব্যবস্থাকে কাঠামোবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব সংবেদনশীল বিষয়ে সুষ্ঠু কাঠামো গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে জাতিকে বড় মূল্য দিতে হবে।
ভাষা নিয়ে শুধু কথার ফুলঝুরি না ছড়িয়ে সাংবাদিকতার জ্ঞান ও দক্ষতায় গভীরতা আনতে হবে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল বাছির সভায় সভাপতিত্ব করেন।
পরে মন্ত্রী বিকেলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কীর্তনখোলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘ডিনস মেরিট অ্যাওয়ার্ড সেরেমনি-২০২৬’ অনুষ্ঠানে যোগ দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. মামুন উর রশীদ ও ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মো. মুহসিন উদ্দিন। এতে সভাপতিত্ব করেন জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন হাফিজ আশরাফুল হক। অনুষ্ঠানে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের ‘ডিনস মেরিট অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংকটের কথা তুলে ধরেন উপাচার্য। পরে বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এসব সংকট নিরসনে তাঁর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আশ্বাস দেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবার আগে প্রয়োজন পর্যাপ্ত অবকাঠামো। শিক্ষার্থীদের জন্য সেমিনার করার কক্ষ, অডিটোরিয়াম ও খেলার মাঠসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় সীমিত, কিন্তু শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য শ্রেণিকক্ষের বাইরের এসব সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন বেশি। দেশের সার্বিক কল্যাণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশি বেশি গবেষণায় মনোনিবেশ করার জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের তাগিদ দেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব সংকট দূর করতে আমি আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’
সোমবার সকালে দুদিনের সফরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বরিশালে পৌছান। সকালে বরিশালে পৌছে তথ্য মন্ত্রী বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়ায় স্বনির্ভর খালের পাশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।